নতুন জন্ম নিবন্ধনের আবেদন করার নিয়ম
নতুন জন্ম নিবন্ধনের আবেদন এখন অনলাইনেই শুরু করা যায়। তবে আবেদন জমা দিলেই কাজ শেষ নয়, কাগজপত্র নিয়ে অফিসে যেতে হয়।
এই পাতায় যা আছে
জন্মের পর রাষ্ট্রের কাছে নিজের অস্তিত্ব নথিভুক্ত করার প্রথম ধাপ জন্ম নিবন্ধন। স্কুলে ভর্তি থেকে শুরু করে পাসপোর্ট, এনআইডি, বিবাহ নিবন্ধন বা জমির রেজিস্ট্রি, সব জায়গাতেই এই একটি কাগজ লাগে।
আবেদনের কাজটা এখন অনেকটাই অনলাইনে হয়ে গেছে। তবে পুরো প্রক্রিয়াটা অনলাইনে শেষ হয় না, সেটা আগে থেকে জেনে রাখা ভালো।
কোথায় আবেদন করতে হয়
নিবন্ধনের দায়িত্ব থাকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের হাতে। আপনি কোথায় থাকেন তার উপর নির্ভর করে কার কাছে যাবেন:
- ইউনিয়ন পরিষদ — গ্রাম বা ইউনিয়নের বাসিন্দাদের জন্য
- পৌরসভা — পৌর এলাকার বাসিন্দাদের জন্য
- সিটি করপোরেশন — ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বড় শহরের জন্য
- ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড — ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসিন্দাদের জন্য
- দূতাবাস বা হাইকমিশন — বিদেশে থাকলে
একটা ভুল ধারণা খুব প্রচলিত, অনেকে ভাবেন জন্মস্থানের অফিসেই যেতে হবে। আসলে নিবন্ধন হয় ঠিকানার ভিত্তিতে। ঢাকার হাসপাতালে জন্ম হলেও পরিবারের স্থায়ী ঠিকানা কুমিল্লার কোনো ইউনিয়নে হলে নিবন্ধন সেখানেই করা যায়।
হাসপাতাল থেকে জন্মের সময় যে ছাড়পত্র বা স্লিপ দেওয়া হয়, সেটি চূড়ান্ত সনদ নয়। সেটি প্রমাণপত্র হিসেবে কাজে লাগে, সনদ নিতে হয় স্থানীয় কার্যালয় থেকে।
অনলাইনে আবেদনের ধাপ
bdris.gov.bd-এ আবেদন ফরম খুলুন
ব্রাউজারে bdris.gov.bd লিখে ঢুকুন, তারপর জন্ম নিবন্ধনের আবেদন অপশনটি বেছে নিন।
এখানেও ঠিকানার শেষে .gov.bd আছে কিনা দেখে নেবেন। এটিই একমাত্র সরকারি আবেদন পোর্টাল, বাকি সব নকল।
আবেদনের প্রথম ধাপে নিবন্ধনের ঠিকানা বেছে নিতে হয় নিবন্ধনের ঠিকানা নির্বাচন করুন
জন্মস্থান, স্থায়ী ঠিকানা নাকি বর্তমান ঠিকানা, কোনটি অনুযায়ী নিবন্ধন করবেন সেটি বেছে নিতে হবে। এরপর বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন বা পৌরসভা নির্বাচন করুন।
এই ধাপে ভুল হলে আবেদন ভুল অফিসে চলে যায় এবং পুরো কাজটা আবার শুরু করতে হয়। তাই ধীরে-সুস্থে বেছে নিন।
ব্যক্তিগত তথ্য পূরণ করুন
নাম বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই লিখতে হবে, জন্ম তারিখ, লিঙ্গ, পিতা-মাতার নাম ও তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর দিতে হবে।
ইংরেজি নামের বানান পাসপোর্ট বা শিক্ষা সনদের সাথে হুবহু মিলিয়ে দিন। পরে অমিল ধরা পড়লে সংশোধনের ঝামেলায় পড়তে হবে।
কাগজপত্র আপলোড করুন
বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্রের স্ক্যান কপি বা স্পষ্ট ছবি আপলোড করতে হবে।
ছবি তোলার সময় পুরো কাগজটি ফ্রেমে রাখুন, লেখা যেন স্পষ্ট পড়া যায়। ঝাপসা ছবির কারণে আবেদন ফেরত আসে।
আবেদন জমা দিয়ে নম্বরটি সংরক্ষণ করুন
সব তথ্য একবার মিলিয়ে দেখে জমা দিন। জমা দেওয়ার পর একটি আবেদন নম্বর পাবেন।
এই নম্বরটি অবশ্যই লিখে রাখুন বা স্ক্রিনশট নিন। পরে আবেদনের অবস্থা দেখতে এবং অফিসে যোগাযোগ করতে এটি লাগবে।
বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
বয়স যত বেশি, প্রমাণপত্রও তত বেশি লাগে। এটাই সবচেয়ে বড় কারণ কেন দেরি না করে আগেভাগে নিবন্ধন করিয়ে নেওয়া ভালো।
| বয়স | সাধারণত যেসব কাগজ লাগে |
|---|---|
| ০ থেকে ৪৫ দিন | হাসপাতালের ছাড়পত্র বা টিকা কার্ড, বাবা-মায়ের এনআইডি |
| ৪৬ দিন থেকে ৫ বছর | টিকা কার্ড বা স্বাস্থ্যকর্মীর প্রত্যয়ন, বাবা-মায়ের এনআইডি, হোল্ডিং ট্যাক্সের রসিদ |
| ৫ বছরের বেশি | শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়নপত্র বা সনদ, বাবা-মায়ের এনআইডি, হোল্ডিং ট্যাক্স রসিদ, চিকিৎসকের বয়স প্রত্যয়ন |
কাগজের তালিকা কার্যালয়ভেদে সামান্য আলাদা হতে পারে। রওনা দেওয়ার আগে একবার ফোনে জেনে নিলে খালি হাতে ফিরতে হয় না।
আবেদনের পরে কী হয়
অনলাইনে আবেদন জমা দিলে একটি আবেদন নম্বর তৈরি হয়। এরপরের ধাপগুলো:
- আবেদনের কপি প্রিন্ট করুন
- মূল কাগজপত্রসহ সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে জমা দিন
- নির্ধারিত ফি পরিশোধ করুন
- কর্তৃপক্ষ তথ্য যাচাই করবে
- অনুমোদন হলে সনদ ইস্যু হবে
কতদিন লাগবে সেটি কার্যালয়ের কাজের চাপের উপর নির্ভর করে। মাঝখানে আবেদনের অবস্থা অনলাইনে দেখে নিতে পারবেন।
সনদ হাতে পাওয়ার পর অবশ্যই অনলাইনে যাচাই করে দেখে নিন সব তথ্য ঠিক আছে কিনা। এই এক মিনিটের কাজটা পরে অনেক বড় ঝামেলা থেকে বাঁচায়।
জন্ম নিবন্ধন আবেদনের ফরম পূরণে যা খেয়াল রাখবেন
ফরম পূরণের সময় ছোট ছোট কিছু ভুল হয়, যেগুলোর কারণে পরে সংশোধনের ঝামেলায় পড়তে হয়।
ইংরেজি নামের বানান। পাসপোর্ট, শিক্ষা সনদ ও জন্ম নিবন্ধনে ইংরেজি বানান একই হতে হবে। MOHAMMAD আর MD, RAHMAN আর RAHAMAN — এমন পার্থক্য পরে বড় সমস্যা তৈরি করে। যে বানানটি শিক্ষা সনদে আছে, সেটিই দিন।
জন্ম তারিখ। যা সত্যি সেটিই দিন। স্কুলের কাগজে ভুল থাকলেও জন্ম নিবন্ধনে সঠিকটা দেওয়াই ভালো, কারণ পরে সব কাগজ এটির সাথেই মেলানো হবে।
পিতা-মাতার এনআইডি নাম্বার। এখানে একটি ডিজিট ভুল হলে যাচাইয়ের সময় ধরা পড়ে এবং আবেদন আটকে যায়। কার্ড হাতে নিয়ে মিলিয়ে লিখুন।
ঠিকানা। স্থায়ী ঠিকানা দেওয়াই নিরাপদ। ভাড়া বাসার ঠিকানা দিলে পরে বদলি হলে সংশোধন করতে হবে।
জন্ম নিবন্ধন আবেদন করার পর কতদিন লাগে
নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই, কার্যালয়ের কাজের চাপের উপর নির্ভর করে। তবে সাধারণ অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি —
| ধরন | সাধারণত যত সময় লাগে |
|---|---|
| নবজাতকের নিবন্ধন | ৩ থেকে ৭ কর্মদিবস |
| ৫ বছরের কম বয়সী | ৭ থেকে ১৫ কর্মদিবস |
| প্রাপ্তবয়স্কের নিবন্ধন | ১৫ দিন থেকে এক মাস |
কাগজপত্র সম্পূর্ণ থাকলে সময় অনেক কমে যায়। মাঝপথে আবেদনের অবস্থা দেখে নিতে পারবেন।
BDRIS GOV BD BR Application
নতুন জন্ম নিবন্ধনের আবেদনের পাতাটিকে ইংরেজিতে BR Application বলা হয় (BR মানে Birth Registration)। bdris.gov.bd এ ঢুকে জন্ম নিবন্ধনের আবেদন অপশনটি বেছে নিলেই এই পাতায় পৌঁছে যাবেন।
আবেদন জমা দেওয়ার পর যে নাম্বারটি পাবেন সেটি দিয়ে পরে আবেদনের অবস্থা দেখা যায়। ওই পাতাটিকে বলা হয় BR Application Status।
তথ্যে ভুল থাকলে সংশোধনের পাতাটি লাগবে, যেটির নাম BR Correction। বিস্তারিত সংশোধনের পোস্টে দেওয়া আছে।
প্রবাসীদের জন্য
বিদেশে থাকলে সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। অনলাইনে আবেদন করার সময় নিবন্ধনের ঠিকানা হিসেবে দূতাবাস নির্বাচন করার অপশন থাকে।
প্রতিটি দূতাবাসের কাগজপত্রের চাহিদা কিছুটা আলাদা হতে পারে। বিশেষ করে সন্তানের জন্ম বিদেশে হলে সেখানকার হাসপাতালের জন্ম সনদ ও অনুবাদ লাগতে পারে। যাওয়ার আগে দূতাবাসের ওয়েবসাইট দেখে বা ফোনে জেনে নেওয়া ভালো।
সনদ পাওয়ার পর করণীয়
সনদ হাতে পেয়েই প্রথম কাজ হলো অনলাইনে যাচাই করে দেখা। নাম, পিতা-মাতার নাম, জন্ম তারিখ, সবকিছু মিলিয়ে নিন।
কোনো ভুল থাকলে তখনই সংশোধনের আবেদন করুন। ভুল যত আগে ধরা পড়ে, ঠিক করানো তত সহজ। বছরখানেক পরে যখন পাসপোর্ট বা এনআইডির কাজে গিয়ে ধরা পড়ে, তখন অনেক বেশি ঝামেলা হয়।
সনদের একটা ছবি তুলে ফোনে বা ইমেইলে রেখে দিন। মূল কাগজ হারিয়ে গেলেও নাম্বারটা হাতে থাকবে।
শেষ কথা
নতুন জন্ম নিবন্ধনের কাজটা যত আগে সেরে ফেলবেন, তত সহজ। জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে করলে ফি লাগে না, কাগজও কম লাগে।
আবেদন জমা দেওয়ার পর আবেদন আইডিটি সংরক্ষণ করুন, আর সনদ হাতে পেয়ে অবশ্যই একবার অনলাইনে যাচাই করে দেখে নিন সব তথ্য ঠিক আছে কিনা।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর
জন্মের কত দিনের মধ্যে নিবন্ধন করাতে হয়?
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন অনুযায়ী জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধন করানোর কথা। এই সময়ের মধ্যে করলে কোনো ফি লাগে না।
অনলাইনে আবেদন করলেই কি সনদ পাওয়া যায়?
না। অনলাইনে আবেদনটি শুরু হয় মাত্র। এরপর প্রিন্ট করা আবেদন কপি ও মূল কাগজপত্র নিয়ে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে যেতে হয়, সেখানে যাচাইয়ের পর সনদ ইস্যু হয়।
বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন না থাকলে সন্তানের হবে কি?
হবে। সেক্ষেত্রে বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। তবে ২০০১ সালের পরে জন্ম নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের নিবন্ধন থাকলে প্রক্রিয়া দ্রুত হয়।
কোন ঠিকানায় নিবন্ধন করতে হবে?
স্থায়ী ঠিকানা অনুযায়ী নিবন্ধন করাই সবচেয়ে নিরাপদ। ঢাকার হাসপাতালে জন্ম হলেও পরিবারের স্থায়ী ঠিকানা যদি অন্য জেলায় হয়, সেখানকার কার্যালয়েই করা ভালো।
প্রবাসীরা কোথায় আবেদন করবেন?
সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের মাধ্যমে। প্রতিটি দূতাবাসের কাগজপত্রের তালিকা কিছুটা আলাদা হতে পারে, তাই যাওয়ার আগে ফোনে জেনে নেওয়া ভালো।
একজনের দুটি জন্ম নিবন্ধন হয়ে গেলে কী হবে?
এটি সমস্যা তৈরি করে। এনআইডি বা পাসপোর্টের সময় তথ্য মেলাতে গিয়ে জটিলতা হয়। এমন হলে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে গিয়ে একটি বাতিল করার আবেদন করতে হবে।
Google-এ প্রিয় সোর্স হিসেবে যুক্ত করুন
এরপর থেকে জন্ম নিবন্ধন সংক্রান্ত সার্চে আমাদের সাইট আগে দেখতে পাবেন।
কোথাও আটকে গেছেন?
কোনো ধাপে সমস্যা হলে, তথ্যে ভুল চোখে পড়লে বা অন্য কিছু জানার থাকলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।